‘দম বন্ধ হয়ে আসছে’, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে এবার লিসবন ও মিলানেও বিক্ষোভ। লিসবনে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান কয়েকশো মানুষের, মিলানে শান্তিপূর্ণ মিছিল ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ। বিক্ষোভকে ‘দাঙ্গাবাজেরা’ ব্যবহার করেছে, অভিযোগ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির। স্পেন ও ফ্রান্সের পর ইউরোপের আরও নানা প্রান্তে ছড়াচ্ছে ক্ষোভ।
আবাসন সংকট, আকাশছোঁয়া ভাড়া আর জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ—এই তিনের চাপে দিশাহারা সাধারণ মানুষ। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে স্পেন ও ফ্রান্সে চলা বিক্ষোভ এবার ছড়িয়ে পড়েছে ইতালি ও পর্তুগালেও। সপ্তাহান্তে মিলানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বিক্ষোভকারীদের একাংশ। বিভিন্ন জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অন্য দিকে, আবাসন সংকটের প্রতিবাদে লিসবনের কেন্দ্রস্থলে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান শুরু করেছেন কয়েকশো মানুষ।
শনিবার মিলানের কেন্দ্রস্থলে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মিছিল শুরু হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবেই। কিন্তু পরে মুখোশধারী এক দল বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর, ফুটপাত থেকে তুলে আনা পাথরের খণ্ড এবং নানা জিনিস ছুড়তে শুরু করেন। পানশালার টেবিল জড়ো করে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ। পরে প্রকাশিত ছবিতে ইতালির ক্যারাবিনিয়েরি বাহিনীর একটি গাড়িকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়। সংবাদ সংস্থা লা প্রেসের খবর, অন্তত দু’জন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন। প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি বলেছেন, বিক্ষোভ দেখানো মানুষের অধিকার। কিন্তু তাঁর কথায়, “আমাদের শহরগুলিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া কোনও অধিকার নয়।” সমাজমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, “দাঙ্গাবাজেরা” বিক্ষোভকে ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়েছে, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আক্রমণ করেছে এবং গোটা শহরকে জিম্মি করে রাখার চেষ্টা করেছে।
মিলানের মধ্য-বামপন্থী মেয়র জুসেপ্পে সালাও হিংসার নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন, “বিক্ষোভের কারণগুলি বোঝা যায়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে হিংসা এবং শহরের গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।”
লিসবনে তাঁবু, স্লোগান, রাতভর অবস্থান
মিলানে সংঘর্ষের ছবি যখন শিরোনামে, তখন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অন্য ছবি। আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান শুরু করেছেন কয়েকশো মানুষ। তিন সপ্তাহ আগে মাদ্রিদে গড়ে ওঠা বিক্ষোভশিবিরের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে এই আন্দোলন।
দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষের মিছিলে অংশগ্রহণের পর শনিবার রাতে লিসবনের রোসিয়ো স্কোয়ারে জড়ো হন কয়েকশো বিক্ষোভকারী। পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় রাজধানীর এই ব্যস্ত চত্বরেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। রাজা চতুর্থ পেদ্রোর মূর্তির চারপাশে বসে গান গেয়ে প্রতিবাদ জানান অনেকে।
৪৬ বছর বয়সি সমাজকর্মী এলেনা কোস্তার কথায়, “পর্তুগালের যে শ্রেণির মানুষ কর দেন, যাঁরা এই দেশটাকে সচল রাখেন, তাঁরাই আজ আক্রমণের মুখে। তাঁরা নিজেদের অধিকার হারাচ্ছেন, বিশেষত বাসস্থানের অধিকার। তাই আমরা সবাই একসঙ্গে এখানে এসেছি বোঝাতে যে, আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
দেশের মধ্য-ডানপন্থী সরকারের সমালোচনা করে ৫২ বছর বয়সি ইঞ্জিনিয়ার আন্তোনিও মারগাদো বলেন, “ভাড়ার ক্ষেত্রে সব নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হচ্ছে। বাড়ির মালিকেরা ক্রমশ বেশি সুরক্ষা পাচ্ছেন। অথচ যেসব ভাড়াটের মাথার উপর একটি ছাদ প্রয়োজন, তাঁদের সুরক্ষা ক্রমশ কমছে।”
সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। এই বৃদ্ধির হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এর জেরে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন তরুণ প্রজন্ম এবং লিসবনের বাসিন্দারা। পর্তুগালের ১ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বৃহত্তর লিসবন মহানগর এলাকায় বসবাস করেন।
উত্তরের শহর পোর্তোতেও আবাসন আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। সেখানে ইতিমধ্যেই কয়েক ডজন তাঁবু খাটানো হয়েছে। শনিবারের লিসবন শিবির সেই আন্দোলনকেই আরও শক্তি জুগিয়েছে।
এর আগে প্রধান শ্রমিক সংগঠন সিজিটিপি-র ডাকে লিসবনে আয়োজিত বিক্ষোভে উন্নত জনপরিষেবা, পেনশন ও মজুরির দাবি ওঠে। পাশাপাশি, লাগামছাড়া আবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারকে পদক্ষেপ করার দাবিও জানান আন্দোলনকারীরা।
পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো স্বীকার করেছেন, সরকারি নীতিতে যে ঘাটতি রয়েছে বলে মানুষ মনে করছেন, তার বিরুদ্ধে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করতে চাইছেন। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সতর্ক করে তিনি বলেন, “পর্তুগালে এমন অস্থিরতা ও বিক্ষোভের পরিবেশ আমদানি করার চেষ্টা করবেন না, যার প্রতি বাস্তবে পর্তুগিজ সমাজের সমর্থন নেই।” তাঁর এই মন্তব্যে ফ্রান্সের সহিংস বিক্ষোভের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আলবেনিয়াতেও আগুন, ফ্রান্সে গ্রেপ্তার ১২০০
শুধু আবাসন বা জীবনযাত্রার ব্যয় নয়, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবার সংকট নিয়েও ক্ষোভ জমছে ইউরোপের নানা প্রান্তে। এই সপ্তাহে আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবস্থা ও চড়া শিক্ষাব্যয়ের প্রতিবাদে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।
শনিবার বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে পাথর, পেট্রলবোমা, ধাতব বস্তু এবং আতশবাজিজাতীয় বিস্ফোরক ছোড়েন। গাড়ি ও আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে সেগুলিকে জ্বলন্ত ব্যারিকেড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সংঘর্ষ বাড়লে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম এমন পদক্ষেপ করা হল।
রাত পর্যন্ত চলে সংঘর্ষ। একটি আদালত, কয়েকটি ব্যাংক ও একটি ডাকঘর-সহ বিভিন্ন ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় অথবা ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। বলকান অঞ্চলের এই দেশটিতে কয়েক মাস ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই নতুন করে অশান্তি ছড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি বিতর্কিত রিসর্ট নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে প্রথমে আন্দোলন শুরু হয়েছিল।
অন্য দিকে, ফ্রান্সে স্কুলের পরিকাঠামো, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, বৈষম্য এবং সরকারি ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ ক্রমে দেশব্যাপী আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। প্যারিসের উত্তর প্রান্তের দরিদ্র শহরতলিগুলির স্কুলের সমস্যাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া প্রতিবাদ এখন শিক্ষার মানের অবনতি ও সরকারি পরিষেবার ঘাটতির বিরুদ্ধেও সরব।
শনিবার ফ্রান্সে ১,২০০-রও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাইস্কুলের পড়ুয়াদের সমর্থনে রাস্তায় নামা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরে কয়েকটি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিভিন্ন ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং দোকানপাটে লুটপাট চলে।
স্পেনে উচ্ছেদ থেকে রাজপথে ক্ষোভ
স্পেনে বাড়তে থাকা ভাড়া ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভ গত মাসে বিস্ফোরিত হয় একটি উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। একটি বিনিয়োগ সংস্থা ৮৭ বছর বয়সি এক মহিলার ফ্ল্যাট কিনে নেওয়ার পর ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানায়। সেই ভাড়া দিতে না পারায় তাঁকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
মারিয়া দেল কারমেন আবাসকাল নামে ওই মহিলা এখন প্রয়াত। তাঁর দুর্দশা বৃহত্তর আবাসন সংকটের প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রতিবাদে স্পেনের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে গড়ে ওঠে বিক্ষোভশিবির। বাসস্থান আরও সহজলভ্য করা এবং ভাড়াটেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব আনে সমাজতন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন সরকার।
কিন্তু কংগ্রেসে ডানপন্থী ও অতি-ডানপন্থী দলগুলি ভোট দিয়ে সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। এর পরেই প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নভেম্বরের শেষে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা করেন।
ইউরোপের একের পর এক দেশে বিক্ষোভের কারণ আলাদা হলেও ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সাধারণ প্রশ্ন—সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আর কতটা রয়েছে বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন? কোথাও ভাড়ার বোঝা, কোথাও চড়া শিক্ষাব্যয়, কোথাও আবার সরকারি পরিষেবার ঘাটতি মানুষকে রাস্তায় নামাচ্ছে। সেই ক্ষোভের সঙ্গে হিংসা মিশে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।